
মুশফাকুর রহমান, বার্তা বিভাগ :
ছয় বছরের শিশু আইমুনাকে নিয়ে প্রায়ই ডাক্তারের কাছে যেতে হয় তার মা আসিয়াকে। প্রতিদিন সকালে মানুষের বাসায় কাজ করতে বের হন তিনি। কাজ শেষে যখন ফেরেন, তখন সন্ধ্যা নেমে আসে। ছোট্ট ঘরে ঢুকতেই মেয়ের কাশির শব্দ শুনতে পান। সেই কাশি মায়ের বুকের ভেতরটায় কেমন যেন তোলপাড় করে।
মেয়েকে নিয়ে এক চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন আসিয়া। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসক জানান, আইমুনার শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে সিসা প্রবেশ করছে। কিন্তু কোথা থেকে আসছে সেই সিসা?
আসিয়াদের ঘরের পাশেই একটি অটোরিকশার গ্যারেজ। সেখানে থাকে ৩০টিরও বেশি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। প্রতিটি গাড়ির ব্যাটারিতে থাকা সিসা যে আশপাশের পরিবেশে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তা জানতেন না গ্যারেজের আশপাশের বাসিন্দারা। চিকিৎসকের পরামর্শে বিষয়টি জানার পর তাদের সেই অজানা ঝুঁকির দিকটিই সামনে আসে।
একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় সাধারণত লেড-অ্যাসিড বা সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারিতে ব্যবহার করা হয়। একটি ১২ ভোল্টের ব্যাটারিতেও সিসা থাকে। চার্জ দেওয়া, ব্যাটারি পরিবর্তন কিংবা পুরোনো ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার সময় সিসাজাত উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন এমন পরিবেশে থাকলে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিয়ানীবাজার উপজেলার সার্বিক চিত্র আরও উদ্বেগের। পৌরশহর থেকে শুরু করে বিয়ানীবাজার উপজেলার এমন কোনো এলাকা নেই, যেখানে ব্যাটারিচালিত রিকশার দেখা মেলে না। শহরের অলিগলি থেকে প্রধান সড়কের আশপাশ— সবখানেই এখন এই বাহনের উপস্থিতি।
বদলে যাচ্ছে পেশা
শুধু যাতায়াতের চিত্রই নয়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বদলে দিচ্ছে মানুষের পেশার ধরনও। দ্রুত নগদ আয় এবং তুলনামূলক সহজে কাজ পাওয়ার সুযোগে অনেকে ছেড়ে দিচ্ছেন পুরোনো পেশা।
একসময় ট্রাকের হেলপার বাবুলের প্রতিদিনের আয় ছিলো প্রায় ৭/৮ শত টাকা। এখন অটোরিকশা চালিয়ে প্রতিদিন ১ হাজার টাকার কম নিয়ে বাড়ি ফেরেন না বলে জানান তিনি।
ট্রাকের হেলপারির কাজ ছেড়ে অটোতে কেন জানতে চাইলে বাবুল বলেন, ‘বাসের হেলপার হয়ে মালামাল ওঠানামা করতে ভালো লাগে না। অটো রাত ১০টার মধ্যে বন্ধ করে বাসায় ফিরতে পারি।’
পৌরশহরের একটি কনফেকশনারিতে কাজ করতেন সাইদুল। এখন তিনি অটোরিকশা চালান। তার চলে যাওয়ায় আক্ষেপ করে কনফেকশনারির মালিক বলেন, ‘আমার ভালো সেলসম্যানটা চলে গেল।’
এমন ঘটনা এখন বিচ্ছিন্ন নয়। মানুষ এখন অটোরিকশা চালানোর দিকে ঝুঁকছেন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। এর প্রভাব পড়ছে শ্রমবাজারেও।
কত অটো, কত ব্যাটারি?
বিয়ানীবাজার পৌরশহসহ উপজেলায় মোট কত ব্যাটারিচালিত রিকশা চলছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
সংখ্যা যতই হোক, এই বিপুলসংখ্যক অটোরিকশার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ব্যাটারি চার্জের বিশাল একটি অবকাঠামো। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্ট। এত বিপুলসংখ্যক পয়েন্টে প্রতিদিন যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে, তার চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ছে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরই।
গতি বাড়ছে, কমছে নিরাপত্তা
অটোরিকশার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে সড়কে বিশৃঙ্খলার অভিযোগও। মালিক-চালকদের বিরোধ, অবৈধ পার্কিং— সব মিলিয়ে অনেক এলাকায় তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের সমস্যা। কোনো কোনো মোড়ে অটোরিকশার জট এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, পথচারীদের রাস্তা পার হওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। দ্রুতগতির অটোরিকশার সামনে পথচারীদের অসহায় হয়ে পড়ার অভিযোগও রয়েছে।
বিয়ানীবাজারের জনপ্রিয় চিকিৎসক ডা: আবু ইসহাক আজাদ মনে করেন, সহজলভ্য ব্যাটারিচালিত রিকশার কারণে মানুষের হাঁটার প্রবণতা কমছে। তার মতে, এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে মানুষের শারীরিক সুস্থতার ওপর। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর সুবিধাটিই সেখানে মুখ্য হয়ে উঠছে।
ব্যাটারির সিসা, বাতাসের অদৃশ্য ঝুঁকি
অটোরিকশার ব্যাটারি ও পরিবেশগত ঝুঁকি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেকে বলেন, মানুষের অজান্তেই ব্যাটারির ক্ষতিকর উপাদান শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে সিসার সংস্পর্শ দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন। তার ভাষায়, সিসা কখন নাক-মুখ দিয়ে শরীরে প্রবেশ করছে, অনেক সময় তা বোঝার উপায় থাকে না।
আইমুনার কাশি তাই শুধু একটি শিশুর অসুস্থতার গল্প নয়। তার ছোট্ট ঘরের পাশের গ্যারেজ, সারি সারি অটোরিকশা, ব্যাটারির চার্জিং আর বাতাসে মিশে থাকা সম্ভাব্য দূষণ— সব মিলিয়ে এটি বিয়ানীবাজারের দ্রুত বদলে যাওয়া শহুরে জীবনেরই একটি ছোট ছবি।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মানুষের চলাচল সহজ করেছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে, অনেকের আয় বাড়িয়েছে। কিন্তু সেই সুবিধার পাশাপাশি ব্যাটারি বর্জ্য, চার্জিং ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়গুলোও সামনে এসেছে। এখন প্রশ্ন হলো— এই বাহনের বিস্তারকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা যায়, যাতে মানুষের চলাচলের সুবিধা বজায় থাকে, আবার আইমুনাদের মতো শিশুদের স্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে না পড়ে।
Leave a Reply