দিনের আলো ফুটতেই সুনসান নীরবতা, কিন্তু মধ্যরাত নামলেই পাল্টে যায় সুরমা নদীর দৃশ্যপট। ট্রলার ও ড্রেজারের বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে তীরবর্তী জনপদ। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও সরকারি স্পষ্ট স্থগিতাদেশ অমান্য করে সিলেটের সুরমা নদীজুড়ে শুরু হয় অবৈধ বালু উত্তোলনের তাণ্ডব। এতে নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন তীরবর্তী লাখো মানুষ, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, সুরমা নদীর জকিগঞ্জ অংশের 'নওয়াগাঁও বালুমহল' (দাগ নং বিএস ৬৬২, আয়তন ২.৪৫ একর)-এর একমাত্র বৈধ ইজারাদার 'মেসার্স সনি সোহা এন্টারপ্রাইজ'। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে এই মহলে আনুষ্ঠানিকভাবে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারী চন্দন তালুকদার জানান, "আমরা সরকারি নির্দেশনা ও আইন মেনে নির্ধারিত সময় থেকে বালু উত্তোলন বন্ধ রেখেছি। কিন্তু আমাদের অজান্তে বা নাম ভাঙিয়ে যদি কোনো অসাধু চক্র রাতের আধারে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে, তবে প্রশাসন যেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়।"
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সরকারি নির্দেশনায় বালুমহল বন্ধ থাকলেও থেমে নেই বালুখেকোরা। শাহগলি, বাঘা, মেন্দীবাগ, কুশিঘাট, কুচাই, শ্রীরামপুর, মুক্তিরচক, মুরাদপুর, নলুয়া, নয়ামসজিদ, হেতিমগঞ্জ, স্বরসতি, বইটিকর ও রানাপিং এলাকার সুরমা তীরজুড়ে গড়ে উঠেছে অবৈধ বালুর বিশালাকার ডাম্পিং পয়েন্ট (স্টক)। রাতের আঁধারে সদ্য উত্তোলিত ভেজা বালু এসব স্টকে জমা করা হচ্ছে।
নদী তীরবর্তী এক ক্ষুব্ধ বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেখানে সরকারি নিয়ম ভেঙে বালু লুটপাট চলছে, সেখানে প্রশাসন অনেকটাই নীরব। কারণ স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের অসাধু কর্তাদের মধ্যে নিয়মিত মাসোহারা ও ভাগ-বাটোয়ারা হচ্ছে। বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কিছু অসাধু নেতা হাত মিলিয়ে এই সিন্ডিকেট চালাচ্ছেন।
তিনি এ সংক্রান্ত বেশ কিছু প্রমাণ ও নথিও আমাদের সামনে তুলে ধরেন।
স্থানীয়দের দাবি, নদী তীরের এসব অবৈধ বালুর স্টক অতি দ্রুত জব্দ ও নিলামে তুললে বালুখেকোদের তৎপরতা অনেকটাই কমে আসবে।
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ ও নদী রক্ষায় সম্প্রতি কানাইঘাট, গোলাপগঞ্জ,বাঘা, জকিগঞ্জ ও শাহগলি এলাকার ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ এবং স্মারকলিপি প্রদান করেছেন।
গত ০১ অক্টোবর সাংবাদিকদের সহযোগিতায় দুপুরে শাহপরান ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় অবৈধভাবে বালু ডাম্পিং করার অপরাধে তিনজনকে আটক করে শাহপরান থানা পুলিশ। তবে স্থানীয়দের মতে, এই পদক্ষেপ মহাসমুদ্রে এক ফোঁটা পানির মতো।
প্রশাসনের এমন ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোলাপগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছবেদ আলী বলেন,অবৈধ বালু উত্তোলনের খবর পাওয়া মাত্র আমরা অভিযান পরিচালনা করি,আপনারা আমাদের কে সহযোগিতা করুন। তিনি আরো বলেন পুলিশ তো আর সারারাত নদীর তীরে পাহারা দিয়ে বসে থাকতে পারবে না, আমাদের অন্য দায়িত্বও পালন করতে হয়।
অন্যদিকে, গোলাপগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও এসিল্যান্ড ফয়সাল মাহমুদ ফুয়াদ স্বীকার করেন, "সুরমায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলন হচ্ছে—এ তথ্য সত্য। আমরা নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। কিন্তু বালুখেকোদের সিন্ডিকেট ও তথ্য নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী। আমরা অভিযানে যাওয়ার খবর আগেই তাদের কাছে পৌঁছে যায়, ফলে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই তারা সটকে পড়ে। এ কারণে অনেক সময় আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তীব্র সীমাবদ্ধতা ও নজরদারির অভাবে সুরমা নদী এখন বালুখেকোদের মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। দ্রুত সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত যৌথ অভিযান পরিচালনা করা না হলে সুরমার রূপ পরিবর্তন হয়ে দেখা দেবে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক : রুবেল আহমদ
নির্বাহী সম্পাদক -হেলান নির্ঝর
উপদেষ্টা : আব্দুর রশিদ।
আইন উপদেষ্টা : এড: আনোয়ার হোসেন, এডিশনাল পিপি, জজ কোট - সিলেট, এড: মামুন আহমদ রিপন, এডিশনাল পিপি, জজ কোট, সিলেট।
বার্তা সম্পাদক : মুশফাকুর রহমান।
অফিস : ১৭ নং সিটি বাণিজ্যিক ভবন, বন্দর বাজার সিলেট।
যোগাযোগ : 01716-220310
ইমেইল - hridoyesylhetnews@gmail.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত